
অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেহেদী হাসানের
┌───────────────────────────
নুর মোহাম্মদ উলিপুর, কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার তবকপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (তহশিলদার) মাসুদ রানার বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেন, সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজে বহিরাগতদের ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে। এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিওতে সেবাগ্রহীতার সঙ্গে টাকা নিয়ে দরকষাকষির কথোপকথন শোনা যাচ্ছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। উলিপুরে ভূমি অফিসে ঘুষ ছাড়া মেলে না সেবা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তবকপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে মাসুদ রানা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দালালদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধসহ বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা।
সরেজমিনে তবকপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গিয়ে দেখা যায়, মাসুদ রানার সঙ্গে দুজন বহিরাগত ব্যক্তি অফিসের বিভিন্ন কাজে যুক্ত রয়েছেন। তাঁদের একজনকে কম্পিউটারে কাজ করতে এবং অন্যজনকে সরকারি রেজিস্টার ও রেকর্ড বই দেখতে দেখা যায়। সরকারি দপ্তরে তাঁদের কী দায়িত্ব এবং তাঁদের পারিশ্রমিক বা বেতন কোথা থেকে আসে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। উলিপুরে ভূমি অফিসে ঘুষ ছাড়া মেলে না সেবা
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা দিতে গেলেও নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত টাকা দিলে খাজনার পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। আবার চাহিদামতো টাকা দিতে না পারলে নানা অজুহাতে কাজ আটকে রাখা হয়। পরে দালাল বা পরিচিত কারও মাধ্যমে গেলে আগে থেকেই টাকার অঙ্ক নির্ধারণ করে নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নামজারির ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা। তাঁদের ভাষ্য, কাগজপত্র দেখে নামজারির কাজ করে দেওয়ার কথা বলে ৮ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১০ হাজার, এমনকি ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়।
নামজারির আবেদন সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর করা হলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিসে তা পাঠানো হয়। এরপর এসএমএসের মাধ্যমে মূল কাগজপত্র নিয়ে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে উপস্থিত হতে বলা হয়। কাগজপত্রে ত্রুটি না থাকলে খসড়া খতিয়ান প্রস্তুত করে প্রস্তাব/প্রতিবেদন সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর পাঠানোর কথা। তবে অভিযোগ রয়েছে, এ পর্যায়ে টাকা না দিলে নানা ধরনের ত্রুটি দেখিয়ে কাজ বিলম্ব করা হয়।
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, প্রতিটি নামজারির প্রস্তাব বা প্রতিবেদন পাঠানোর জন্য ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। কাগজপত্রে কোনো সমস্যা থাকলে সেই অজুহাতে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সেবাগ্রহীতা বলেন, তাঁর ছোট ভাইয়ের মাধ্যমে একটি নামজারির বিষয়ে তহশিলদার মাসুদ রানার সঙ্গে কথা হয়। তখন কাজটি করে দেওয়ার জন্য ৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তিনি চাকরির কারণে বাইরে থাকায় ছোট ভাইকে পাঠিয়েছিলেন। পরে ছুটি নিয়ে বাড়িতে এসে নিজে অফিসে গেলে তাঁর কাছে ১২ হাজার টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগকারীদের দাবি, তবকপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দায়িত্ব নেওয়ার আগে ধরনীবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালনকালেও মাসুদ রানার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ ছিল।
এদিকে, তবকপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে অনুসন্ধানের সময় ধারণ করা একটি ভিডিওতে একজন সেবাগ্রহীতার সঙ্গে টাকা নিয়ে দরকষাকষির কথোপকথন শোনা যায়। ভিডিওতে ওই ব্যক্তি প্রথমে ১ হাজার টাকা দেন। টাকার পরিমাণ কম হওয়ায় আরও ২০০ টাকা বাড়িয়ে দেন। সেটিও যখন দিয়ে লাভ হয় না, তখন তহশিলদারের পক্ষ থেকে আরও ৫০০ টাকা দাবি করা হয়। সব মিলিয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়। পরে টাকা কম হওয়ায় ওই ভূমি কর্মকর্তাকে একপর্যায়ে ৫০০ টাকা কম দেওয়া লছ হয়েছে বলেও ভিডিওতে বলতে শোনা যায়।ভিডিওতে আরও বলতে শোনা যায়,ওই ভূমি কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, আগে ধরনীবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে প্রতি নথিতে ১ হাজার টাকা করে নিতেন।
অভিযোগের বিষয়ে তবকপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মাসুদ রানার কাছে জানতে চাইলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,যদি নিয়ে থাকি, আমি সংশোধন হবো।
এ বিষয়ে উলিপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম মেহেদী হাসান বলেন,অপরাধ প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সেবা প্রত্যাশীদের দাবি নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষের হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।