
ডেস্ক রিপোর্ট:
রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগের দুই দিন পর সরকারি বাসভবন বঙ্গভবন ছাড়লেন মো. সাহাবুদ্দিন। রোববার (২৬ জুলাই) দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে তিনি রাজধানীর গুলশানে নিজ বাসভবনের উদ্দেশে রওনা হন। এর আগে গত ২৪ জুলাই তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
সংবিধান অনুযায়ী পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও মো. সাহাবুদ্দিন দায়িত্ব পালন করেছেন প্রায় তিন বছর তিন মাস।
তার পদত্যাগের পরই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), তার অপসারণ ও গ্রেফতারের দাবি তোলে। এ পরিস্থিতিতে সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব কি না—তা নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
দেশের একাধিক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞের মতে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় সরকারি দায়িত্বের অংশ হিসেবে নেওয়া সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে দায়মুক্তি থাকলেও, ব্যক্তিগতভাবে সংঘটিত কোনো ফৌজদারি বা দেওয়ানি অপরাধের ক্ষেত্রে সেই সুরক্ষা প্রযোজ্য নয়।
তাদের ভাষ্য, সংবিধানের ৫১(১) অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতির দাপ্তরিক কর্মকাণ্ডকে আদালতের জবাবদিহির বাইরে রাখে। আর ৫১(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি দায়িত্বে থাকাকালে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা, গ্রেফতার বা কারাবাসের জন্য কোনো পরোয়ানা জারি করা যায় না। তবে এই সুরক্ষা রাষ্ট্রপতির দায়িত্বকাল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের মতে, রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের বাইরে সংঘটিত কোনো ব্যক্তিগত অপরাধ, দুর্নীতি বা রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের অপরাধ ৫১ অনুচ্ছেদের দায়মুক্তির আওতায় পড়ে না। ফলে পদত্যাগের পর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
একই মত দিয়েছেন সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন। তিনি বলেন, দাপ্তরিক দায়িত্বের বাইরের কোনো কর্মকাণ্ড বা ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে সাবেক রাষ্ট্রপতিও আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে পারেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামও মনে করেন, সংবিধানে রাষ্ট্রপতি পদে থাকার সময়ের সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের আগে বা দায়িত্ব ছাড়ার পর সংঘটিত বা উদ্ভূত অপরাধের বিষয়ে আইনি পদক্ষেপে বাধা নেই।
তবে এ বিষয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্নার মতে, সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ রয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, অভিযোগগুলো যদি আগে থেকেই থেকে থাকে, তাহলে রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়ে কেন তা সামনে আনা হয়নি।
অন্যদিকে, মো. সাহাবুদ্দিন নিজে দাবি করেছেন, সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। তার ভাষায়, তিনি কোনো অপরাধ করেননি এবং তাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যেই এসব অভিযোগ আনা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সংবিধান অনুযায়ী তার মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত থাকার কথা ছিল। তবে গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে নির্ধারিত সময়ের প্রায় দুই বছর আগেই তিনি পদত্যাগ করেন।
তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে ভারতের পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথিত ফোনালাপ, রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে বিভিন্ন দায়িত্বে থাকাকালে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ, ব্যাংক খাত-সংক্রান্ত বিতর্ক এবং জুলাই আন্দোলন সংশ্লিষ্ট অভিযোগ তুলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন বিচার দাবি করেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আদালতের চূড়ান্ত রায় হয়নি।
Leave a Reply