
চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম, আংশিক সার নিয়ে ফিরছেন কৃষকরা
শাকুর মাহমুদ চৌধুরী, উখিয়া:
কক্সবাজারের উখিয়ায় আমন মৌসুমে সার সংকট ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক কৃষক চাহিদা অনুযায়ী সার না পেয়ে আংশিক সার নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। আবার কেউ কেউ সার না পেয়েই ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬) উখিয়া সদর স্টেশনে সার ডিলারদের দোকানের সামনে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় কৃষকদের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক কৃষক প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। কেউ আংশিক সার পেলেও তা দিয়ে জমির প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন তারা।
কৃষক আলী হোসেন বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী সার না পেয়ে আংশিক সার নিয়ে ফিরতে হচ্ছে। এতে ফসলের সঠিক পরিচর্যা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেক কৃষক আবার সার না পেয়েই বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন।
উপজেলা কৃষি-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, চলতি আমন মৌসুমে উখিয়ায় প্রায় ৯৭০ দশমিক ৫ হেক্টর জমিতে আমন চাষাবাদ হচ্ছে। এর বিপরীতে সর্বশেষ বরাদ্দ এসেছে প্রায় ৯৬ মেট্রিক টন সার। উপজেলার সার বিতরণ ব্যবস্থায় রয়েছেন ৯ জন ডিলার ও ৪২ জন সাব-ডিলার।
কৃষকদের অভিযোগ, জমির পরিমাণ ও ফসলের প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে বরাদ্দ ও বিতরণে সামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে না। ফলে সার সংগ্রহ করতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক কৃষককে প্রয়োজনের তুলনায় কম সার নিয়ে ফিরতে হচ্ছে।
একজন কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ধান ফলাতে জমি প্রস্তুত করেছি, বীজতলা করেছি, শ্রমিকের খরচ দিয়েছি। এখন সময়মতো সার না পেলে পুরো পরিশ্রমই ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। দিনের পর দিন লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও যদি প্রয়োজনীয় সার না পাই, তাহলে কৃষক যাবে কোথায়?”
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, উখিয়া উপজেলায় শস্য কৃষকের সংখ্যা ১৯ হাজারেরও বেশি। এছাড়া মৎস্যচাষি প্রায় ২ হাজার ৬০০ জন এবং প্রাণিসম্পদ খাতের কৃষক ও খামারির সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার।
কৃষকদের দাবি, উৎপাদন মৌসুম শুরুর আগেই জমির পরিমাণ, ফসলের ধরন ও কৃষকের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে সারসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণের পরিকল্পিত সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু সংকট দেখা দেওয়ার পর তৎপরতা শুরু হওয়ায় অনেক সময় মাঠপর্যায়ে এর সুফল পাওয়া যায় না।
সার বিতরণ ব্যবস্থায় ডিলার ও সাব-ডিলারদের ভূমিকা নিয়েও কৃষকদের একটি অংশের অভিযোগ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, কোথাও কোথাও বিতরণে অনিয়ম, সমন্বয়হীনতা ও কারসাজির কারণে প্রকৃত কৃষকরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে কৃষি অফিসের তদারকি, সার বরাদ্দ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তদারকি ও দায়িত্ব পালনে ঘাটতির অভিযোগও করেছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তা, ডিলার ও প্রশাসনের বক্তব্য জানা এবং মাঠপর্যায়ে তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
আমন ধান কৃষকের কাছে শুধু একটি ফসল নয়; অনেক পরিবারের সারা বছরের খাদ্য ও আয়ের অন্যতম অবলম্বন। তাই সময়মতো সার না পাওয়া উৎপাদন ব্যাহত করার পাশাপাশি কৃষক পরিবারের খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
কৃষকদের দাবি, বরাদ্দ ও বাস্তব চাহিদার মধ্যে সমন্বয় করে পর্যাপ্ত সার সরবরাহ, স্বচ্ছ তালিকা প্রণয়ন, সুষ্ঠু বিতরণ এবং নিয়মিত মাঠপর্যায়ে তদারকি নিশ্চিত করা হোক।
এক কৃষকের ভাষায়, “আমরা দয়া চাই না—আমরা চাই আমাদের ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় সারটুকু সময়মতো পাওয়ার নিশ্চয়তা।
উখিয়ার কৃষকদের এই দাবি ও ভোগান্তির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
Leave a Reply